বিপুল মিয়া, ফুলবাড়ী (কুড়িগ্রাম) প্রতিনিধি: প্রবেশপথে বাঁধা হচ্ছে গরু। সিঁড়ি ও গ্যালারিতে পড়ে আছে বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও প্যাকেট। চারপাশে আগাছা, খড়কুটো ও ময়লা-আবর্জনা। জানালার অংশ ভাঙা। ভেতরে ধুলাবালি আর মাকড়সার জালের মধ্যে এলোমেলোভাবে পড়ে আছে কম্পিউটার। অথচ পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীদের তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষায় এগিয়ে নিতে প্রায় ৫৬ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয়েছিল এই আইসিটি সেন্টার।
এ চিত্র কুড়িগ্রামের ফুলবাড়ী উপজেলার বিলুপ্ত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ায় নির্মিত আইসিটি সেন্টারের। ২০২১ সালে উদ্বোধনের পর প্রায় ছয় বছর পেরোতে চললেও সেন্টারটি আজও কার্যকরভাবে চালু হয়নি। বছরের পর বছর তালাবদ্ধ পড়ে থাকায় একদিকে নষ্ট হচ্ছে সরকারি সম্পদ, অন্যদিকে কম্পিউটার শিক্ষা, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এলাকার শিক্ষার্থী ও তরুণ-তরুণীরা।
একসময় নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত ছিটমহল দাসিয়ারছড়ার বাসিন্দাদের জন্য আইসিটি সেন্টারটি ছিল নতুন স্বপ্নের প্রতীক। স্থানীয়দের প্রত্যাশা ছিল, এখানে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের পাশাপাশি ইন্টারনেট ব্যবহার, অনলাইন আবেদন ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা মিলবে। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ও চাকরিপ্রত্যাশীদের আর এসব কাজের জন্য দূরে যেতে হবে না। কিন্তু উদ্বোধনের পর সেই প্রত্যাশা বাস্তবে রূপ নেয়নি।
সরেজমিনে দেখা গেছে, দীর্ঘদিন ব্যবহার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনটির বিভিন্ন অংশে অবহেলার ছাপ পড়েছে। চারপাশ আগাছায় ছেয়ে গেছে। ভবনের প্রবেশপথে গরু বাঁধা হচ্ছে। সেখানে জমে আছে শুকনো খড়কুটো ও ময়লা-আবর্জনা। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার গ্যালারিতে পড়ে রয়েছে বিড়ি-সিগারেটের অবশিষ্টাংশ ও প্যাকেট। ভবনের বাইরে ছড়িয়ে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের বোতল।
ভবনটি তালাবদ্ধ থাকলেও ভাঙা জানালার অংশ দিয়ে ভেতরের চিত্র দেখা যায়। সেখানে ধুলাবালি ও মাকড়সার জালের মধ্যে কম্পিউটারসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম পড়ে রয়েছে। দীর্ঘদিন ব্যবহার না হওয়ায় এসব যন্ত্রপাতির কার্যক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দা রুবেল মিয়াসহ কয়েকজনের অভিযোগ, উদ্বোধনের সময় কেন্দ্রটি ঘিরে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে সেটি চালুর কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি। ইন্টারনেট সংযোগ, প্রয়োজনীয় জনবল ও অন্যান্য জটিলতায় কেন্দ্রটি বন্ধ রয়েছে। সরকারি অর্থে নির্মিত একটি স্থাপনা বছরের পর বছর এভাবে পড়ে থাকলেও যথাযথ জবাবদিহি নেই বলেও অভিযোগ তাদের।
দাসিয়ারছড়া মহাবিদ্যালয়ের আইসিটি বিষয়ের শিক্ষক জয়ন্ত চন্দ্র সরকার বলেন, “ছিটমহলের শিক্ষার্থী ও তরুণদের কম্পিউটার শিক্ষা, ইন্টারনেট সুবিধা এবং ডিজিটাল সেবা দেওয়ার কথা ছিল এই সেন্টার থেকে। বাস্তবে তারা কোনো সুবিধাই পাননি। এটি সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দায়িত্বহীনতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।”
দাসিয়ারছড়া মহাবিদ্যালয়ের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহমুদ হাসান বলেন, “আইসিটি সেন্টারটি চালু থাকলে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, অনলাইন আবেদন, চাকরির প্রস্তুতি ও বিভিন্ন ডিজিটাল সেবা সহজেই পাওয়া যেত। বছরের পর বছর ধরে ভবনটি বন্ধ থাকায় আমরা সেই সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছি।”
ছিটমহল বিনিময় আন্দোলনের নেতা মো. আলতাফ হোসেন বলেন, “আমাদের এলাকার শিক্ষিত ছেলেমেয়েদের কম্পিউটার শিখতে ফুলবাড়ী ও কুড়িগ্রামে যেতে হয়। আইসিটি সেন্টারটি চালু হলে এই এলাকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের বিরাট উপকার হতো।” তবে কেন্দ্রটি চালু না হওয়ার পেছনে অবকাঠামোগত সমস্যা ও জনবল সংকটের কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট দপ্তর।
উপজেলা তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি অধিদপ্তরের আইসিটি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, “দাসিয়ারছড়া আইসিটি সেন্টারটিতে অবকাঠামোগত কিছু দুর্বলতা রয়েছে। ভবনের ওপরের প্লাস্টিকের টিনসহ ছাদ চুইয়ে পানি পড়ে, লোকবলও নেই। কিছু কম্পিউটারে সমস্যা হয়েছে। এগুলো চিহ্নিত করে সমস্যা সমাধানের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠিয়েছি।”
এদিকে স্থানীয় বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীদের দাবি, শুধু ভবন নির্মাণ করে ফেলে না রেখে দ্রুত সংস্কার ও প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগের মাধ্যমে আইসিটি সেন্টারটি কার্যকরভাবে চালু করা হোক। একই সঙ্গে কম্পিউটার ও অন্যান্য সরঞ্জাম পরীক্ষা ও মেরামত করে ইন্টারনেট সংযোগসহ প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দাবি তাদের।
তাদের প্রত্যাশা, যে উদ্দেশ্যে লাখ লাখ টাকা ব্যয়ে সেন্টারটি নির্মাণ করা হয়েছিল, দ্রুত সেই উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন হবে এবং বিলুপ্ত ছিটমহলের তরুণ প্রজন্মের তথ্যপ্রযুক্তি শেখার দীর্ঘদিনের অপেক্ষার অবসান ঘটবে।


